

বসুন্ধরা গ্রুপের সঙ্গে পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরের কেন এত দহরম মহরম? ফ্যাসিবাদের প্রোপাগান্ডা সেলের অন্যতম সদস্য সৈয়দ বোরহান কবিরের স্ত্রী অদিতি করিম। আদালতের নির্দেশে একবার তার ব্যাংক হিসাবও জব্দ হয়েছিল। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অদিতি করিমের ব্যাংক হিসাব খোলার সময় পেশায় লেখা রয়েছে গৃহিণী। কিন্তু তার ব্যাংক হিসাবে ছিল ৯ কোটি টাকা। আবার গত বছরের ১৫ জুন সকল যুক্তি উড়িয়ে দিয়ে অদিতির ব্যাংক হিসাব জব্দের নোটিসকে অবৈধ ঘোষণা করে দেন ফ্যাসিবাদের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক।
অনুসন্ধানে পাওয়া যায় অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা হাইকোর্ট পর্যন্ত সৈয়দ বোরহান কবিরের স্ত্রীর সাফল্য আলাদিনের চেরাগকেও হার মানায়। হাজারো মামলার জটে থাকা হাইকোর্ট বিভাগে অতিদ্রুততার সঙ্গে তার মামলার রুল জারি ও শুনানি নিষ্পত্তি হয়।
সুযোগমতো ফ্যাসিবাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে বিচারকের আসনকে এখনো অপব্যবহার করছেন। সৈয়দ বোরহান কবিরের মতো একজন চিহ্নিত ফ্যাসিবাদের দোসরের স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব জব্দই শুধু নয়, আরো অনেকের জামিনও মঞ্জুর করেছেন ইতোমধ্যে।
এখন কথা হলো অদিতি করিমের লেখা নিয়মিত দেখা যাচ্ছে বসুন্ধরার পত্রিকা কালের কণ্ঠে। যা-তা লিখছেন এবং বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ সেটা ছাপছেও।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি তার কলামে লেখেন, বেরিয়ে আসছে ইউনূস সরকারের লুটতন্ত্রের ইতিবৃত্ত। যেন তিনি একমাত্র ইউনূস সরকারের লুটতন্ত্রের সমস্ত তথ্য নিয়ে বসে আছেন। আর কোনো মিডিয়া কিছুই জানে না।
এতে তিনি লিখেছেন, “ড. ইউনূসের দেড় বছরের শাসনকালের নানা অকথিত অধ্যায় ধীরে ধীরে প্রকাশ হতে শুরু করেছে। ২৪-এর ৫ আগস্ট এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ড. ইউনূসকে ক্ষমতায় বসান। …কিন্তু ইউনূসের দেড় বছরের শাসনকাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ শাসন। সুশাসনের বদলে ইউনূস সরকার স্বেচ্ছাচারিতা আর অনিয়মের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, বৈষম্য বিলোপের বদলে নতুন করে বৈষম্য সৃষ্টি করেছিলেন ইউনূস। তবে ইউনূসের শাসনকালের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো দুর্নীতি আর লুটপাট।”
শুধু অভিযোগ আছে অভিযোগ আছে বলে বিস্তর কাহিনি ফেঁদেছেন সৈয়ব বোরহান কবিরের স্ত্রী অদিতি করিম।
অবশ্য এই অদিতি করিমের একই অঙ্গে অনেক রূপ। যখন প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ইউনূস দায়িত্ব পালন করছিলেন তখন তেল উপচে পড়েছিল অদিতি করিমের লেখায়।
বসুন্ধরা
যেমন ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল বেশি তেলে চুপচুপে ভেজে লেখেন, ‘ড. ইউনূসের বিশ্বব্যাপী সুপার ডিপ্লোম্যাসি”। গত বছরের ৭ আগস্ট লেখেন ‘ধন্যবাদ ড. ইউনূস’। ইউনূস তাঁর জীবনে যেসব ভালো কাজ করেননি, সেগুলোও লেখে ফেলেন ভাবী। গত ২০ আগস্ট অল্প তেলে মুচমুচে ভাজায় লেখেন, “প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দৃঢ়চিত্ত ড. ইউনূস”। ফেব্রুয়ারি আগের ১৪ মাসে ইউনূসকে এমন প্রচুর বন্দনা ভাবী লিখেছেন।
কিন্তু এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকেই অদিতি ভাই ইউনূসের সমালোচনায় মুখর। মুড সুইং ৩ এপ্রিল লেখেন, “যেখানেই প্রতারণা, সেখানেই ইউনূস সরকার”। ১৯ মে লেখেন, “ইউনূসের বিত্তবৈভব প্রতারণা ও জালিয়াতি”। ২৬ মে লেখেন, “সবাইকেই ধোঁকা দিয়েছেন ইউনূস?”
ইউনূসের প্রশংসা করে লেখাগুলোতে যেমন তথ্যসূত্র নেই, সোর্সিং নেই- মনের মাধুরির বরাতে লেখা; সমালোচনা করে লেখাগুলোও তাই। যেমন বোরবার কবির তথ্যসূত্র ছাড়াই লিখতেন, “যে কোনো সময়ে নোবেলের খবর দিতে শেখ হাসিনাকে টেলিফোনের পাশে থাকতে বলেছে কমিটি।”
কেউ কেউ অবশ্য এটাও বলেন যে এসব লেখা অদিতি করিমের নামে ফ্যাস্টিস্টের দোসর সৈয়দ বোরহান কবিরেরই লেখা।
প্রশ্ন হলো বসুন্ধরা কেন এই বোরহান কবির ওরফে অদিতি করিমের ভিত্তিহীন লেখা ক্রমাগত প্রকাশ করে চলেছে? ব্যানানা রিপাবলিক তৈরির এ কারিগরদের লক্ষ্য কী? কাকে খুশি রেখে কী ষড়যন্ত্র করে চলেছে? ঘুঁটি হিসেবে এসব আওয়ামী ফ্যাসিস্ট দোসর বোরহান কবির গংদের হাতের কাছে রাখছে কোন স্বার্থে?
এর আগে ২০২৫ সালের ৮ জুলাই এক পতিত ফ্যাসিস্টদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মেশিনারির চাকা সচল হতে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপকে ‘মিডিয়া মাফিয়া’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন, একটি মাফিয়া গ্রুপের বিরুদ্ধে তাঁর যৌক্তিক বক্তব্য ও অবস্থানকে কিছু সাংবাদিক ‘গণমাধ্যমের প্রতি হুমকি’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। বসুন্ধরার পক্ষে বিবৃতি দেওয়ায় জাতীয় প্রেসক্লাবের নেতাদেরও কড়া সমালোচনা করেছেন হাসনাত।
ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ এ কথাগুলো বলেছেন। বসুন্ধরা গ্রুপকে ‘ভূমিখেকো, বহু বছর আগে থেকে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ও মিডিয়া মাফিয়া’ উল্লেখ করে হাসনাত বলেছেন, ‘আমি আমার বক্তব্যে যা বলার স্পষ্টভাবেই বলেছি এবং এখনো আবার স্পষ্টভাবেই বলছি, আমি ভূমিখেকো, বহু বছর আগে থেকে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত, মিডিয়া মাফিয়া বসুন্ধরা গ্রুপের কর্তৃপক্ষকে হুঁশিয়ার করেছি, যাতে তারা অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে ডিজইনফরমেশন এবং হেট (অপতথ্য ও ঘৃণা) ছড়ানো বন্ধ করে এবং পেশাদার সাংবাদিকতায় মনোযোগ দেয়।’ হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের স্বাধীন মিডিয়াকে কোনো হুমকি কখনো দেইনি, বরং আমি স্বাধীন মিডিয়ার পক্ষে একজন অ্যাডভোকেট (সোচ্চার ব্যক্তি)। কিন্তু স্বাধীনতার নামে ফ্যাসিবাদের দোসরদের প্ল্যাটফর্ম দেওয়া এবং যে কারও বিরুদ্ধে ডিজইনফরমেশন ছড়ানো হলে তা মেনে নেওয়া হবে না।’
এবার বোরহান কবীরের একটু অতীত ঘাঁটা যাক। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত নাসিম সাহেবের ভাগ্নে সৈয়দ বোরহান কবীর নব্বইয়ের দশকের শেষে বিটিভিতে “পরিপ্রেক্ষিত” নামের একটি তথাকথিত “অনুসন্ধানমূলক”’অনুষ্ঠান করে সমাজের নানা পেশার চোর-বাটপারদের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছিলেন।
৯৬ এর নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ পুনরায় ২০০৮ এ ক্ষমতায় আসীন হবার পর ভুঁইফোড় অনলাইন পোর্টাল “বাংলা ইনসাইডার” খুলে সেই “পরিপ্রেক্ষিত”অনুষ্ঠানের মতোই বোরহান কবীর মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করে নিজের ফায়দা লুটের চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
নিজে “বাংলা ইনসাইডার” এর মতো একটা “গুজবের ফ্যাক্টরি” খুলে মানুষের চরিত্রহনন করতে থাকা এই বোরহান কবীর সাম্প্রতিক সময়ে বসুন্ধরার এমডি আনভীর সোবহানের পক্ষ নিয়ে কলম ধরেছেন। নাগরিক টিভির মতো একটি নিরপেক্ষ মিডিয়াকে তিনি “স্বাধীনতা বিরোধীদের দোসর” আখ্যা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন মুনিয়া হত্যার বিচার দাবি আমাদের মূল দাবি নয়, আমাদের মূল দাবি বিএনপি- জামাতকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা করা!
আনভীরের টাকা খেয়ে এরূপ জঘন্য মিথ্যাচার করে তিনি মূলত মুনিয়া ইস্যুকে “ক্ষমতার পট পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র” হিসেবে লেবেল করে আনভীর সোবহানকে বাঁচিয়ে দেবার প্রজেক্ট হাতে নিয়েছেন।
আবার সায়েমসোবহান ডট কম সাইটের একটি লেখাতেও দেখা যায় বোরহান কবীরের তথাকথিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ।
সুতরাং যোগাযোগটা এবার পরিষ্কার। তবে প্রশ্ন হলো পতিত ফ্যাসিস্টকে পকেটে রেখে কী পরিকল্পনা আঁটছে ঢাকার উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখা বসুন্ধরা গ্রুপ?
