
ঢাকার শহরতলিতে গত দুই দশকে দ্রুত বদলে গেছে জমির চেহারা। ধানখেতের জায়গায় উঠেছে আবাসিক প্রকল্প, সড়কের পাশে তৈরি হয়েছে বাণিজ্যিক ভবন, আর একসময় গ্রামের যে জমি কয়েক লাখ টাকায় বিক্রি হতো, তার দাম এখন কয়েক কোটি। সাধারণ মানুষের জায়গাজমি দখল করে গড়ে ওঠে বড় আবাসন। মধ্যবিত্তরাও পরম নিশ্চিন্তে রক্ত লেগে থাকা জমি, ফ্ল্যাট কিনে নেন। তারা ভুলে যান, এইসব জমির দখলবাজির ইতিহাস। তারা এও জানেন না যে তারাই মূলত দিনে দিনে রাষ্ট্রের ভেতর আরেকটি রাষ্ট্রের হাত শক্তিশালী করে দিচ্ছেন নিজেদের অজান্তে। এমনকি এই বসুন্ধরা এখন জুলাই আন্দোলনকেও কলুষিত করার চক্রান্তে লিপ্ত। অভিযোগ উঠেছে—‘টাকা ও পাচার করা ডলারের পাহাড়ের ওপর বসে দেড় হাজার শিশু-কিশোর ও তরুণের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করতে তাদের হাত একটুও কাঁপছে না। ’

বাংলাদেশের অন্যতম বড় মাফিয়া-ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপ। আবাসন ব্যবসাই প্রতিষ্ঠানটির মূল শক্তি।
বসুন্ধরার কিছু আবাসন প্রকল্পের জমি কীভাবে তাদের হাতে এসেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কয়েক মাস ধরে জমির দলিল, নামজারি নথি, খতিয়ান, ভূমি অফিসের কাগজপত্র, আদালতের নথি, স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে এমন কয়েকটি জমির সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলোর মালিকানা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বসুন্ধরা -সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরোধ রয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগ এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। তাই বসুন্ধরার মালিকপক্ষ সবসময়ই রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
যে জমি বিক্রি করতে চাননি রহিমা বেগম (ছদ্মনাম)
বসুন্ধরার বর্তমান আই ব্লক যেখান, সেখানে ৪২ শতাংশ জমির মালিক ছিলেন রহিমা বেগমের পরিবার। কয়েক প্রজন্ম ধরে ওই জমিতে চাষাবাদ হয়েছে।
রহিমা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের দিকে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি প্রথমে জমিটি কেনার প্রস্তাব দেন।
পরিবারটি রাজি হয়নি।এরপর শুরু হয় আরেক ধরনের চাপ।
রহিমার অভিযোগ, জমির সীমানায় মাটি ফেলা শুরু হয়। একটি অংশে রাস্তা তৈরির কাজও শুরু হয়। পরে তারা জানতে পারেন, পাশের একটি আবাসন প্রকল্পের নকশায় তাদের জমির একটি অংশ রাস্তার জন্য দেখানো হয়েছে।
দলিলপত্র পরীক্ষা করে দেখা যায়, জমিটির মালিকানা নিয়ে কয়েক বছর ধরে একাধিক প্রশাসনিক ও দেওয়ানি বিরোধ হয়েছে।
অনুসন্ধানে আই ও জে ব্লকের কয়েকটি জমির ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই এলাকার একাধিক জমির মালিক প্রথমে স্থানীয় একটি ছোট প্রতিষ্ঠানের কাছে জমি বিক্রি করেছেন। পরে সেই প্রতিষ্ঠান জমি বিক্রি করেছে আরেকটি কোম্পানির কাছে।
শেষ পর্যায়ে জমিগুলো চলে গেছে বসুন্ধরা গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে।
কাগজে-কলমে প্রতিটি লেনদেন আলাদা।
এই মধ্যবর্তী কোম্পানিগুলোর প্রকৃত মালিক কারা?
কোম্পানি নিবন্ধন নথি পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা গেল, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে একই ধরনের নাম, ঠিকানা ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
আরও অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন পরিচালক বসুন্ধরা গ্রুপের বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত।
আরেকটি ঘটনায় অনুসন্ধানকারীরা জানতে পারেন, একটি জমির মালিককে বাজারদরের তুলনায় কম দামে জমি বিক্রির জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একজন জমির মালিক বলেন, প্রথমে তাকে বলা হয়েছিল—
“জমি বিক্রি না করলে প্রকল্পের রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা কঠিন হবে।”
বসুন্ধরার বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে আরেকটি অভিযোগ রয়েছে—জমি অধিগ্রহণ বা জমি সংক্রান্ত বিরোধে তারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করেছে।
এই সূত্রে বসুন্ধরার সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে। এনসিপি নেতারা বিভিন্ন সময়ে বসুন্ধরার জমি ব্যবসা ও এলপিজি ব্যবসায় একক আধিপত্য নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন।
এরপর এনপিসির কয়েকজন নেতা দাবি করেন, তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা, প্রশাসনিক হয়রানি এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
অন্যদিকে বসুন্ধরার পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে।
যেভাবে জমি দখল করে বসুন্ধরা
বসুন্ধরা গ্রুপ
↓
সহযোগী কোম্পানি
↓
জমি সংগ্রহকারী মধ্যস্বত্বভোগী
↓
স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি
↓
ভূমি ও প্রশাসনিক দপ্তর
↓
রাজনৈতিক যোগাযোগ
বসুন্ধরায় ফ্ল্যাট জমি কেনার আগে সাবধান!
বসুন্ধরায় ফ্ল্যাট বা জমি কেনার মানেই আপনি সেই জমির মালিক হয়ে গেলেন, ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। সেই ফ্ল্যাট বা জমি বিক্রি করতে গেলেও আপনাকে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষের পকেটে ঢোকাতে হবে মোটা অঙ্কের ‘চাঁদা’। ফ্ল্যাটের প্রতি বর্গফুট হিসেবেও দিতে হবে ১ টাকা হারে চাঁদে। জমি বিক্রির ক্ষেত্রে প্রতি কাঠায় এই চাঁদার পরিমাণ ১০ লাখ টাকাও হতে পারে! মানে ৫ কাঠার একটা জমি যতবার বিক্রি হবে ততবার ৫০ লাখ টাকা করে ঢুকবে বসুন্ধরা মাফিয়ার পকেটে। এর প্রতিবাদ করতে গেলেই বসুন্ধরার গুন্ডাবাহিনী আপনাকে গুম করে দেবে না হয় মারধর করে এলাকাছাড়া করবে। আবার ভুয়া অভিযোগ ও মামলা দিয়ে হয়রানির ঘটনাও আছে।
আর এসব মাফিয়াবাজি করতে তারা তাদের মিডিয়াগুলোকে ব্যবহার করে ‘পাহারাদার’ হিসেবে। এক্ষেত্রে বড় পাহারাদারের ভূমিকা রাখছে কালের কণ্ঠ পত্রিকা ও নিউজ২৪ চ্যানেল।
অবশ্য এই সব মিডিয়া হাউস পালন করার পেছনে বসুন্ধরার মালিকপক্ষের নারী-লালসাও একটি বড় কারণ। কারণ এসব হাউসের যোগাযোগ কাজে লাগিয়েই কিছু লোকজন বসুন্ধরার মালিক থেকে শুরু করে পরিচালক পর্যায়ের নানা ব্যক্তিবর্গকে ‘সাপ্লাই’ দিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ আছে।
বসুন্ধরাকে এখন ঢাকার বুকে অনেকেই ক্যান্সারের সঙ্গে তুলনা করছেন। কারণ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতে বসুন্ধরা গ্রুপ নিকট ভবিষ্যতে ঢাকার ৩০ ভাগ মানুষের নিয়ন্ত্রণকর্তা হতে চলেছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের অনেকেই যারা না বুঝে বসুন্ধরার ফাঁদে পা দিয়ে জমি বা ফ্ল্যাট কিনতে চলেছেন তাদের ঘিরেই মূলত এই কোম্পানির ‘রাজা’ হয়ে ওঠার বাসনা মাথাচাড়া দিয়েছে।
‘‘বসুন্ধরার মালিককে তুইতোকারি করেছিলি, এত বড় সাহস তোর।”
বসুন্ধরার মালিক আহমেদ আকবর সোবহান এবং তার ছেলে আনভীরের নাম বলে নির্যাতন করা হয়েছে এনসিপির নেতা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এই মাফিয়া গোষ্ঠীর হাত এতটাই লম্বা তারা কারাবন্দী একজনকে এভাবে নির্যাতন করতে পারে। এদের কি কোনো বিচার হবে না—জাতির কাছে আমার প্রশ্ন।’ ওই ঘটনার পর কারাগারেও একটি অন্ধকার কক্ষে নিয়ে তাঁকে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ করেন তানভীর।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক আবু সাঈদ লিয়ন, কেন্দ্রীয় মিডিয়া উপকমিটির সদস্য ইয়াসির আরাফাত, এনসিপির চিকিৎসক সংগঠন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্যসচিব আবদুল আহাদ প্রমুখ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া, বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া লিমিটেডের বিভিন্ন মিডিয়া এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিথ্যাচার করছে বলে অভিযোগ তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
শুক্রবার (৩ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দৈনিক কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ডেইলি সান ও বাংলানিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনে এনসিপি। দলের দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পাঠক ও দর্শকদের আস্থা ধরে রাখতে সংবাদমাধ্যমগুলোকে দায়িত্বশীল আচরণ করারও আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যম জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং এর নেতাদের নিয়ে চরম অপেশাদারত্ব ও নিয়মিত বিরতিতে সংঘবদ্ধ প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে আসছে। সাংবাদিকতার স্বীকৃত মানদণ্ড উপেক্ষা করে কোনো প্রমাণ ছাড়াই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের চরিত্রহনন করা হচ্ছে। স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী এনসিপি এমন ঘৃণ্য তৎপরতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংবাদমাধ্যম সর্বদা গণস্বার্থের পক্ষে থাকবে বলেই একে ‘গণমাধ্যম’ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু বসুন্ধরা গ্রুপের ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া লিমিটেডের অধীন দৈনিক কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ডেইলি সান এবং বাংলানিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে নানাবিধ প্রচারণায় লিপ্ত হয়ে গণবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে। বিশেষত, এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ জাতীয় সংসদে উল্লেখিত সংবাদমাধ্যমগুলোতে গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী দল আওয়ামী লীগের পক্ষে টানা বয়ান তৈরি এবং নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কর্তৃক অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার পর এই প্রোপাগান্ডা মেশিন আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে এনসিপি উল্লেখ করেছে, প্রমাণাদি ছাড়াই এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহসহ জুলাইয়ের নেতাদের নিয়ে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের ফলে সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর থেকে সাধারণ পাঠক ও দর্শকদের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের টক-শোগুলোতে আওয়ামী গণহত্যার পক্ষে বয়ান তৈরির মহোৎসব চলছে।
