Wednesday, October 14
Shadow

সচিবরাই বাংলাদেশ ধ্বংস করবে | পর্ব ১ | ঢাকা চট্টগ্রাম রেললাইনে তুঘলকী কারবার

৭০ টাকার চাল যদি আপনার কাছে জোর করে ৮৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হয়, আমি বাজি ধরে বলতে পারি আপনি তেজগাঁও ঘেরাও দিবেন। কিন্তু ৭০ টাকার প্রকল্প ৮৩০ টাকায় করা হইলে, আর আপনাকে এই অপচয় নিয়ে সাবধান করলে আপনি কেয়ার পর্যন্ত করবেন না।
করেন না।

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ দিকে। কিন্তু কমলাপুর থেকে ট্রেনে উঠলে সেটা দক্ষিণ দিকে না গিয়ে উত্তর দিকে যাইতে শুরু করে। গাজীপুর, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে অবশেষে সেটা রাইট ট্র্যাক অর্থাৎ কুমিল্লায় আসে। ২৩০ কিলোমিটারে সময়, তেল, শ্রম অপচয়।

এই সমস্যা সমাধানের সহজ উপায় হলো ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ দিয়ে কুমিল্লা পর্যন্ত রেল লাইন বসানো। মাত্র ৮১ কিলোমিটার রেল লাইন। চীন সরকার এমন রেললাইন ১ সপ্তাহয় বসাতে পারে।

বুঝলাম আমরা চাইনিজ না। কিন্তু অন্তত ভারত বা পাকিস্তান তো হতে পারি। ওদের সাথে তো রক্ত সেইম। জাত সেইম। ভারতে প্রতি কিলোমিটার রেল লাইন বানাতে খরচ হয় ১৭ থেকে ৬০ কোটি টাকা। পাহাড়ের সাথে মিলায়েন না। পাহাড়ে সুরঙ্গ করে রেল লাইন করতে আরও বেশি খরচ হয়। আমি সমতলের সর্বোচ্চ খরচটাই ধরি। ৬০ কোটি টাকা।

৮১ কিলোমিটারে ৬০ কোটি টাকা করে রেল লাইন বসাতে মোট খরচ হবে ৪৮৬০ কোটি টাকা।

এই রেললাইন যাবে নিচু ধানী জমি দিয়ে, চর দিয়ে, খাস জমি দিয়ে। আমি তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি এগুলা উঁচু ধানী জমি। ৩ লাখ টাকা শতাংশ। তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি এই ৮১ কিলোমিটারের মধ্যে কোন খাস মহল নেই।

জমি লাগবে ৩২২ একর। ৩ লাখ টাকা শতক হিসাবে ৯৬৬ কোটি টাকা। অধিগ্রহণে যেহেতু ২গুণ দাম দেয়, তাহলে ১৯৩২ কোটি টাকা।

নির্মাণ আর অধিগ্রহণ মিলিয়ে ৬৮০০ কোটি টাকা।
কিন্তু সরকার খরচ করবে ৮৪ হাজার কোটি টাকা।

১৩ গুণ বেশি খরচ।

কিন্তু যারা এই দূর্নীতিটা করবে তারা কাঁচা লোক না। ১৩ গুণ বেশি খরচ করার জাস্টিফিকেশন দিয়েই তারা করবে।

এই কয়দিন ধরে তারা (আমলা+বিদেশি কর্পোরেট+দাতা গোষ্ঠী ঋণের মহাজনীরা) আমাদের অযোগ্য মন্ত্রিপরিষদকে পড়াপানি দিয়েছে যে ৩২২ একর জমি অধিগ্রহণ করে রেল লাইন বানাতে বানাতে তারেক রহমান বুড়া হয়ে যাবে।
হাজার হাজার মামলা পড়বে আদালতে। নেতাকর্মী, স্থানীয় জমির দালালরা ফেইক ঘর বাড়ি মসজিদ তুলে দূর্নীতি করতে চাইবে। তো সমাধান হলো ফ্লাইওভার করে দেন। ফ্লাইওভার দিয়ে ট্রেন চলবে। ব্যাপক উন্নয়ন হবে।

এই যুক্তির সমস্যা হলো – ফ্লাইওভার শূন্যের উপর বানানো হয় না। জমি অধিগ্রহণ সরকারকে করতেই হবে। ইটস আ মাস্ট। মামলায় সরকারকে পড়তেই হবে। ইটস আ মাস্ট।

এখানে সরকারের কর্তব্য ছিল মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি। শক্ত হাতে মোবাইল কোর্ট আর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে ফেইক বাড়ি ঘর, ফেইক মসজিদের উপর বুল্ডোজার চালানো।
আপনি বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতি দেশ শাসন করবেন আর ক্ষেত্রবিশেষে বুল্ডোজার চালাবেন না – তা হয় না।

গুলিস্তান থেকে রায় সাহেব বাজার পর্যন্ত বুল্ডোজার চালিয়ে ইংলিশ রোড সম্প্রসারিত করার জন্য ঢাকাবাসী চিরকাল স্বৈরাচার এরশাদকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

যাইহোক, আমলা আর উন্নয়ন কর্পোরেটগুলা অযোগ্য ক্যাবিনেটকে বুঝাতে পেরেছে যে নরমাল রেললাইন এনাফ সেক্সি না। কোথায় মেট্রো, কোথায় রূপপুর, আর আপনি কিনা বানাবেন সামান্য রেললাইন!
আসেন ১৩ গুণ বেশি খরচ করে জিনিসটাকে এক্সোটিক মেগাপ্রকল্প বানাই। অনেক লালো ভাগবে।

এখানে একটা গল্প খুব প্রাসঙ্গিক। বলতে চাইনি। কিন্তু মেজাজ এতো খারাপ যে বলতে বাধ্য হচ্ছি।

এই দেশের একটা মন্ত্রণালয় নিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর মন খারাপ। এই সেক্টরটার কিছু একটা করতে হবে। উনি মন্ত্রীকে ডাকালেন, প্রতিমন্ত্রীকে ডাকালেন। উপদেষ্টাকে ডাকালেন।

সেক্টরটার জন্য, সেক্টরের লোকগুলার জন্য আমাদের কিছু একটা করতে হবে। পরদিন মন্ত্রী ফিরে এসে নিজেই সচিবের রুমে ঢুকলেন। কিছু একটা করতে হবে। পাল্টে দিতে হবে এই সেক্টরের চেহারা।

সচিব সভা আহবান করলেন। সভাপতির আসনে মন্ত্রী বললেন, চলেন এই অবহেলিত সেক্টরের জন্য আমরা কিছু করি।

২ মাস পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা শাখা থেইকা ৪৭ টা প্রকল্প একনেকে পাঠাইসে যেন এই সেক্টরের জন্য, সেক্টরের লোকগুলার জন্য অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত ১৮৫ টা বিল্ডিং নির্মাণ করা যায়।

আমি এই প্রকল্পের তালিকা দেখে হতভম্ব। কিন্তু মন্ত্রী সাহেবদের দেখলাম নির্বিকার। তারা পুতুলের মত সভার সূচনা বক্তব্য দিচ্ছেন। মৌখিকভাবে প্রকল্প পাশ করছেন। সভায় সব কথাবার্তা, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আমলারা। এই সিদ্ধান্তগুলো বুঝতে পর্যন্ত পারছে না মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। শেষে সবাইকে সঠিকভাবে দ্রুত কাজ করার আহবান জানিয়ে মন্ত্রী সাহেব পতাকা উড়িয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছেন।
আমার জাস্ট মনে হলো লোকটার কি কমন সেন্স নাই নাকি অভিনয় করে!?

আমাদের মন্ত্রীরা প্রচন্ড ইনকনফিডেন্সে ভুগে। সালাহউদ্দিন, ববি হাজ্জাজ, এহসানুল মিলন, শাহে আলম টাইপের জাঁদরেল কয়েকজন বাদ দিলে বাকিরা একগাদা সচিবের সামনে পড়ে প্রচন্ড নার্ভাস ফিল করেন। আপনার বাইরে থেকে মনে হতে পারে এই মন্ত্রীরা টাকা খেয়ে দুনিয়া উল্টায় ফেলতেসে।
বিশ্বাস করেন, বেশিরভাগ মন্ত্রী দূর্নীতি করতেসে না। তারা জাস্ট গাছ বলদ। সচিবরা যদি বলে, “দাঁড়ান, উঠেন, তিন বার ঘুরেন আর ডাকেন ঘেউ!”
এরা ঠিক তাই করবে।
পাছে যদি কেউ বুঝে যায় যে, এই সেক্টরের মন্ত্রীর এই সেক্টর নিয়ে ধারণা নেই!!

এই কারণে ৫৩ জনের বিশাল মন্ত্রিসভায় আমরা ৬-৭ জনকে চিনি। বাকিরা ভয়ে মিডিয়াকে পর্যন্ত ফেস করার সাহস পান না। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া তো অনেক দূরের আলাপ।

অস্থায়ী এদেরকে দিয়ে এই স্থায়ী আমলা, স্থায়ী ঋণদাতা মহাজন, আর স্থায়ী ঠিকাদার ব্যবসায়ীরা সমানে কংক্রিটের প্রকল্প করায়।

জমি অধিগ্রহণ লিগাল সমস্যা মনে হইলে একজন প্রধানমন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে জুডিশিয়ারির লোকবল ৪ গুণ বাড়িয়ে ফেলবে। ভারত বা পাকিস্তানের দামে রেল লাইন, মেট্রো লাইন করতে না পারলে একজন প্রধানমন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে বুয়েটের বাজেট ৫ গুণ বাড়িয়ে বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বিদেশ থেকে প্রফেসর ভাড়া করে আনবে।
রিফর্মস আর সিস্টেম ঠিক করতে, শিক্ষা আর গবেষণা ঠিক করতে, কেরাণীগঞ্জে বাসায় বাসায় ছোট ছোট কারখানা বসাতে প্রধানমন্ত্রী ক্ষিপ্ত হয়ে কোটি কোটি টাকা ইনভেস্ট করবে।

কিন্তু আপনি দেখবেন সরকারের সকল কাজ শেষে সিমেন্টের বস্তায় গিয়ে ঠেকে। তারা কর্মসূচী বুঝে না। বিল্ডিং বুঝে। হাজারে বিজারে অপ্রয়োজনীয় সেতু, কালভার্ট, বিল্ডিং বানিয়ে ফেলে রাখে। আর আমরা হাসপাতালে গেলে সেবা পাই না। একটা জন্মনিবন্ধনের জন্য ভিখারির মত ঘুরি। নভেম্বর মাস আসলে সরকারকে একগাদা টাকা দিই। ভ্যাট দিই, মাল্টার উপর ১৪০% কাস্টমস দিই।

আমলারা তাদের দূর্নীতি ডিফেন্ড করার জন্য প্রতি ৫ বছর একটা রাজনৈতিক দলকে ভাড়া খাটার দায়িত্ব দেয়। ২০২৬ সালে এই দায়িত্ব পেয়েছে বিএনপি। দলটির মন্ত্রীদের সামান্য কমন সেন্স, কৌতুহল, ব্যক্তিত্ব কিছুই কাজ করে না যে তাদের মন্ত্রণালয়গুলোতে হচ্ছেটা কী!

আর আপনি তো আছেন আপনার মত মাশাল্লাহ।
রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আমার আইডেন্টিটি পলিটিক্সের ফালতু/ফাত্রা লেখায় ২৩ হাজার লোক রিএক্ট দেয়। কাজের আলাপ করলে সেটার কোনদিন কোন রিচ হয় না।

আপনারা এই সিস্টেমটাই ডিজার্ভ করেন। করেন সাফার। আপনাদের মোবারকবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *