Tuesday, February 17
Shadow

রাজনীতির আয়নাবাজি

মোঃ রাফিউজ্জামান রাফি

রাজনীতি এক সময় ছিল ত্যাগ, আদর্শ আর জনগণের মুক্তির সংগ্রামের নাম। ইতিহাস সাক্ষী—নেলসন ম্যান্ডেলা থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা মাহাথির মোহাম্মদের মতো নেতারা রাজনীতিকে শুধুই ক্ষমতা নয়, বরং জনগণের কণ্ঠ হিসেবে দেখেছেন। অথচ আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, সেই রাজনীতি যেন ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে এক ধরনের আয়নাবাজিতে—যেখানে বাস্তবতা ও অভিনয়, নীতি ও সুবিধাবাদ, সত্য ও প্রচারণা পরস্পরকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে চলে। প্রশ্ন জাগে: আমরা কি সত্যিকারের রাজনীতি দেখছি, নাকি নিছক এক রাজনৈতিক মায়াজালে আটকে আছি?

আয়নাবাজি মানে কী?

আয়নাবাজি—অর্থাৎ ছলনার চিত্রনাট্য, চোখের ভেলকি, বাস্তবকে আড়াল করে এক ধরনের মায়া সৃষ্টি। একদিকে যা দেখা যায়, অন্যদিকে তার সম্পূর্ণ বিপরীত বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে পর্দার আড়ালে। রাজনীতিও আজ অনেকটা এমন—নেতার হাসিমুখ, দরিদ্রের ঘরে গিয়ে ভাত খাওয়া, বন্যায় কোমর পানিতে হাঁটার সেই দৃশ্যগুলো আমাদের মন ছুঁয়ে গেলেও, তার পেছনের বাস্তবতা প্রায়শই শূন্য।

নির্বাচনের আগে ও পরে: দুই চেহারার রাজনীতি

প্রতিটি নির্বাচনের আগে নেতারা হয়ে ওঠেন জনগণের অতি আপনজন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে শোনা যায় উন্নয়নের ফিরিস্তি, ঘরে ঘরে পৌঁছায় ম্যানিফেস্টো। অনেকেই ‘মাটির মানুষ’ সাজতে গিয়ে হেঁটে চলেন গ্রামবাংলার পথে, হাতে তুলে নেন কৃষকের কাস্তে বা মুচির ছুরি।
কিন্তু নির্বাচনের পরে?

এক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে নির্বাচনের পরপরই জনসংযোগ ৬০% কমে যায়, প্রতিশ্রুতির মাত্র ২০-২৫% বাস্তবায়িত হয়।

ইতিহাসের আয়নাতেও প্রতিচ্ছবি

আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজনীতি ছিল জনগণের জন্য, বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে ছিল। তখনকার রাজনীতিকরা জনগণের ভাষা বোঝতেন, তাঁদের সঙ্গে মিশতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়গুলোতে, বিশেষ করে সামরিক শাসনের পর থেকে, রাজনীতি একটি শ্রেণির ব্যবসায় রূপ নেয়—যেখানে বিনিয়োগ, চুক্তি ও সুবিধার বিনিময়ে পাওয়া যায় দলীয় টিকিট আর পদ।

আজ রাজনীতিকদের অনেকে কোটি টাকার মালিক, অথচ তাঁদের অতীত জীবনে অর্থনৈতিক অবস্থান ছিল নগণ্য। প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই উত্থান কি আদর্শের, নাকি আয়নাবাজির ফসল?

প্রচারণার বাস্তবতা: মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া ও পিআর

রাজনীতির এই আয়নাবাজিতে আজ প্রযুক্তি এক বড় ভূমিকা রাখে। মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট, ফটোশুট, সাজানো ভিডিও, প্রপাগান্ডা—সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় বিশেষজ্ঞদের হাতে। একদিক থেকে দেখতে গেলে, রাজনীতিকরা হয়ে উঠছেন অভিনেতা, আর পিআর প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে পরিচালক।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভাইরাল’ হওয়া এক নেতার হাঁটু পানির ছবি হয়তো লাখো শেয়ার হয়, কিন্তু পানির নিষ্কাশনে কার্যকর উদ্যোগ নেয় না কেউ।

জনগণের দায়

এই আয়নাবাজির জন্য কেবল রাজনীতিকরা দায়ী নন, দায় আমাদেরও। আমরা অনেক সময় চোখের সামনে মিথ্যা দেখেও চুপ থাকি, দলীয় আবেগে সত্যকে অস্বীকার করি। আমরা প্রশ্ন করি না, বিশ্লেষণ করি না, বরং বিশ্বাস করি যতটা আমাদের ভালো লাগে। এই মানসিকতা রাজনীতিকদের আয়নাবাজিকে সহজ করে তোলে।

আশা ও উত্তরণের পথ

তবে সবই অন্ধকার নয়। শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম, নাগরিক সাংবাদিকতা ও স্বাধীন চিন্তাশীল জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে আয়নার ফাঁক দিয়ে বাস্তবতা দেখার চেষ্টা করছে। ‘ফ্যাক্ট চেকিং’ ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের প্রবণতা বাড়ছে, যার ফলে মিথ্যা প্রচারণা আগের মতো সহজে বিক্রি হচ্ছে না

উপসংহার

রাজনীতি যদি আদর্শবিহীন হয়, তবে তা কেবল ক্ষমতার খেলা হয়ে দাঁড়ায়। আর ক্ষমতার এই খেলাটি যখন মঞ্চস্থ হয়, তখন রাজনীতি হয়ে ওঠে আয়নাবাজি—যা দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, কিন্তু মন বোঝে এর ভিতর ফাঁপা।

আমাদের দায়িত্ব হলো এই আয়নাবাজির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যকে খুঁজে বের করা, প্রশ্ন তোলা, বিশ্লেষণ করা এবং সঠিক রাজনীতিকে সঙ্গ দেওয়া। কারণ রাজনীতি এক মহান ব্রত—অভিনয় নয়, আয়নাবাজি নয়; এটি হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণের প্রতিচ্ছবি।
নাম : মোঃ রাফিউজ্জামান রাফি
সম্মান : প্রথম বর্ষ ( রাষ্ট্রবিজ্ঞান)
কবি নজরুল কলেজ, ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *