Sunday, November 30
Shadow

দুর্নীতি, ভুয়া পরিচয় আর ভাঙা রাষ্ট্রযন্ত্র: নৈতিক বিপর্যয়ের নতুন সামাজিক ভূগোল

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনীতি এবং সমাজজীবনের ভেতরে যে গভীর ক্ষয় প্রতিনিয়ত জমে উঠছে—তার অসংখ্য সূক্ষ্ম ও স্থূল চিহ্ন প্রতিদিনই চারপাশে ভেসে উঠছে। কোথাও ভুয়া কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা, কোথাও সেবা খাতে লুটপাট, কোথাও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সামান্য কর্তৃত্বের অপব্যবহার, আবার কোথাও সামান্য সুযোগ পেলেই বিশেষ সুবিধা আদায়ের সংস্কৃতি। সমাজ যেন এক ধরনের সম্মিলিত নৈতিক ভাঙনের মধ্য দিয়ে অচেনা এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র কোনো একক ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন অঞ্চলের সমস্যা নয়; বরং সমগ্র বাংলাদেশে প্রসারিত একটি ভয়াবহ বিস্তারের নাম—দায়মুক্তি ও অনিয়মকে স্বাভাবিক ধরে নেয়ার সংস্কৃতি।

সাম্প্রতিক সময়ে যশোরের সার্কিট হাউজে ভুয়া অতিরিক্ত সচিব পরিচয়ে সরকারি সুবিধা ভোগের ঘটনা কেবল একজন প্রতারকের বুদ্ধিমত্তা বা দুঃসাহসের গল্প নয়; এটি হলো রাষ্ট্রের সুরক্ষা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই, দায়িত্ববোধ, এবং জনসম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্রমাগত শৈথিল্যের প্রতীকি রূপ। যে সার্কিট হাউজে নিরাপত্তার জন্য বহুগুণ কঠোরতা থাকার কথা, যে স্থানে সরকারি পরিচয় নিশ্চিত করার স্পষ্ট প্রটোকল থাকার কথা, সেখানে একজন ব্যক্তি খুব সহজে উচ্চপদস্থ সরকারের কর্মকর্তা সেজে বিশেষ সুবিধা ভোগ করেন—এটি শুধু হাস্যকর নয়, বরং ভয়ানক।

কারণ বিষয়টি আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে যে, ব্যক্তি পর্যায়ে যেমন নৈতিক পতন ঘটছে, তেমনই প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে দায়িত্বশীলতার কাঠামোতে গভীর ফাটল তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের মধ্যে জবাবদিহির ঘাটতি, স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা, এবং বিভিন্ন অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সংস্কারহীন প্রটোকলগুলোই এমন প্রতারণাকে সহজ করেছে। আমরা একদিকে দুর্নীতি নিয়ে নীতিকথা বলি, অন্যদিকে এমন দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড় করিয়ে রাখি যা প্রতিদিনের বাস্তবে দুর্নীতিকে আরও শক্তিশালী করে।

সমস্যা শুধু প্রতারকের নয়; সমস্যাটি হচ্ছে সেই গোষ্ঠীর যারা দায়িত্বে থেকেও দায়িত্ব পালন করেন না, যারা তথ্য যাচাইয়ের নামে চোখ বুজে থাকেন, যারা প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে বারবার ‘এমন তো হয়’ বলে পাশ কাটিয়ে যান। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই বৈকল্য সামগ্রিকভাবে নাগরিক আস্থাকে ভেঙে দেয়। একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে বিশ্বাস করবে যে তার নিরাপত্তা, তার সার্বভৌম অধিকার, বা তার ন্যায়বিচারের কাঠামো সঠিকভাবে কাজ করছে?

এই অবস্থায় সমাজ এগোয় কীভাবে? রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষায় যারা প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করেন, তাদের প্রচেষ্টা বিফলে যায় ক’জন অসাধু ব্যক্তি ও ক’টি দুর্বল কাঠামোর কারণে। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে যে শুধু প্রশাসনিক স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকে না—তা সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্যও যথেষ্ট স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের চোখে সরকারি পদমর্যাদা বা প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। যখন জনগণ মনে করে, ‘যে কেউ চাইলে পরিচয় বানিয়ে ক্ষমতার আসন দখল করতে পারে’, তখন রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয়ে অস্থিতিশীলতার নতুন রূপ নিচ্ছে।

এই নৈতিক ভাঙন কেবল সমাজ ও প্রশাসনেই সীমাবদ্ধ নয়; রাজনীতিতেও এর গভীর শেকড়। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দলের নাম ভাঙিয়ে সুবিধা নেওয়া, কিংবা প্রভাবশালী কোনো নেতার নাম ব্যবহার করে প্রটোকল ভাঙার ঘটনাগুলো এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেকেই মনে করেন—বাংলাদেশে আসল ক্ষমতা আর নিয়ম–শৃঙ্খলা কোনো লিখিত কাঠামোতে নেই; বরং অনিয়মের নিজস্ব এক গোপন শক্তিশালী সিস্টেম জন্ম নিয়েছে। সেই সিস্টেমই মাঝে মাঝে এমন প্রতারকদের জন্য দরজা খুলে দেয়, কখনো সুযোগ তৈরি করে, কখনো আবার প্রশাসনকে অকার্যকর করে দেয়। ভুয়া পরিচয়ে সরকারি সুবিধা ভোগের ঘটনা তাই বড় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং এই বৃহত্তর সিস্টেমেরই বহুমাত্রিক প্রতিফলন।

একসময় আমাদের প্রশাসন ছিল গৌরবের বিষয়, জনসেবার প্রতীক; এখন সেই প্রতীক মাঝে মাঝে রূপ নিচ্ছে হাস্যকর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবিতে। এটি থামাতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন জরুরি, কঠোর যাচাই-বাছাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি, এবং প্রশাসনিক মানবসম্পদকে দায়িত্বশীলতার নতুন প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক নৈতিকতার পুনর্জাগরণও জরুরি, কারণ ব্যর্থতা কেবল যান্ত্রিক নয়—এটি মানবিক ও নৈতিক ব্যর্থতার যৌথ ফল।

দিনশেষে আমরা যদি এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে নাগরিক নিরাপত্তা, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, তবে প্রতারণা ও অনিয়মের এই চক্র ভাঙতেই হবে। প্রশাসনকে তার মূল কাঠামোতে ফিরিয়ে আনতে হবে, দায়বদ্ধতার ওপর জোর দিতে হবে, এবং যারা রাষ্ট্রের নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা করে—তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এটাই সময় নিজেকে প্রশ্ন করার: আমরা কি এমন রাষ্ট্র রেখে যেতে চাই যেখানে পরিচয়ই প্রধান শক্তি, নাকি এমন রাষ্ট্র যেখানে সততা, দক্ষতা এবং জবাবদিহি মৌলিক ভিত্তি?

— জেমস আব্দুর রহিম রানা

সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *