Sunday, February 15
Shadow

গণতন্ত্রের নবযাত্রা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর এবং আনন্দঘন নির্বাচন আগে কখনো হয়নি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এটি কেবল একটি নির্বাচন নয়, বরং দেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আশা-পূরণের প্রতীক।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের পূর্বে বারবার বলেছেন, ‘ইতিহাসের সেরা’ এবং ‘বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী’ নির্বাচন হবে। নির্বাচনের দিন সেই কথার যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন এবং সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান নির্বাচনের সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের আন্তরিকতা, দৃঢ় নেতৃত্ব এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই ভোটাররা শান্তিপূর্ণভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন।

প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, আনসারসহ সকল গোয়েন্দা সংস্থা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোও—বিএনপি, জামায়াত জোটসহ—নির্বাচনের সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও নির্বাচনের প্রশংসা করেছে, এটিকে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

নির্বাচনের আগে দেশে নানা অনিশ্চয়তা এবং শঙ্কার পরিবেশ ছিল। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে নির্বাচনের সম্ভাব্য বানচালের প্রচেষ্টা চলছিল। ভারতে পলাতক স্বৈরাচারী নেতা শেখ হাসিনা নির্বাচনের বয়কট আহ্বান করলেও দেশের মানুষ তা উপেক্ষা করে গণতন্ত্রের পথে এগিয়েছে। নির্বাচনের দিন কোথাও সহিংসতা বা সংঘাত হয়নি। ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঈদ উৎসবের মতো ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছেন।

 নির্বাচনে বিএনপি ভূমিকম্প সদৃশ বিজয় অর্জন করেছে। ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২৯৭ টি আসনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিজয়ী হিসেবে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এরমধ্যে বিএনপি জোট পেয়েছে ২১২টি, জামায়াত জোট ৭৭টি এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য প্রার্থীরা ৮টি আসন। গণভোটে ‘হা’ ভোট বিজয়ী হয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব এবং জনগণের আস্থা দলটিকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে। এছাড়াও জামায়াত ও এনসিপির তরুণ নেতৃত্বও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

নব নির্বাচিত সংসদ দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। নির্বাচিতদের সমন্বয়ে খাদের কিনারায় থাকা দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, গণতন্ত্রের সুসংহত যাত্রা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিরোধীদলও সংযত এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সহায়তা করবে।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ দেখিয়েছে, সৎ ও আন্তরিক প্রচেষ্টা, স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং জনগণের আস্থা থাকলে গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এটি কেবল দেশের মানুষের জন্য নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও অনুসরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। এটি শিক্ষা দেয় যে, গণতন্ত্র কেবল ভোটের মাধ্যম নয়, এটি হলো জনগণের মুক্ত মতপ্রকাশ, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের ফল। এই নির্বাচন দেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম, আশা এবং অর্জনের সাক্ষ্য হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

@ জেমস আব্দুর রহিম রানা 

সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *