রকিবুল ইসলাম :হামিদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে, অর্থাৎ এসএসসি পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হলাম হামিদপুর আলহেরা মহাবিদ্যালয়ে। মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে থাকলেও উচ্চমাধ্যমিকে এসে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। অথচ ভর্তি হওয়ার কথা ছিল যশোর সিটি কলেজে। ভাগ্যিস সেদিন ক্যাম্পাসে ছাত্রদের বোমাবাজিতে ভয় পেয়ে ওখানে ভর্তি না হয়ে আলহেরা কলেজে এসেছিলাম। এটা হওয়ারই ছিল। বিধাতা লিখে রেখেছিলেন ললাটে। তা না হলে হয়তো আসমার সাথে আমার দেখা হত না কখনোই।

দুধে আলতা গায়ের রং, লিকলিকে গড়ন, মানানসই উচ্চতা আর ঘাড় বাঁকানো চুলে বেশ বাহারি লাগত মেয়েটাকে। বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে তার মাঝে নিহিত ছিল বন্ধু ভাবাপন্ন মনোভাব। নবীন বরণ অনুষ্ঠানের দিন থেকেই তার সাথে আলাপ। সেও বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। বাণিজ্য বিভাগে ছাত্র-ছাত্রী কম থাকায় আমরা ক্লাসের একে অপরের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ পেলাম।
আমাদের ক্যাম্পাস ছিল এল-আকৃতির। সম্মুখ ভাগে বড় খেলার মাঠ। নতুন স্থাপিত কলেজ বিধায় সব শ্রেণীকক্ষ পাকা অর্থাৎ ইট-সুড়কির ইমারত ছিল না। বাঁশের চাটাইয়ের বেড়া ছিল। তারপরও আমি, আমরা উপভোগ করেছি সেই দিনগুলো। যথারীতি পাঠদান শুরু হয়ে গেল। নতুন কলেজ! সুনাম যেন হয়, এ জন্য সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ সদা তৎপর ছিলেন। আইন-কানুন ছিল বেশ কড়া। পাঠদান করা হত অনেকটা প্রাইভেট টিউটরদের মতো করে। ফলস্বরূপ, কয়েক বছরের ব্যবধানে আমাদের কলেজটি রেজাল্টের দিক দিয়ে যশোরের মধ্যে শীর্ষে উঠে এসেছিল।
আসমার বাবা ডাক্তার ছিলেন। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে আসমা সবার বড়। অন্যদিকে, আমি তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট। কলেজে প্রথম প্রথম পিছনের সারিতে বসতাম। ইংরেজি ও বাংলা বিষয়ের পাঠদান করা হত সব বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে একসাথে একটি বড় পাঠদান কক্ষে। একটু দুষ্টুমি করতাম, খুনসুটি চলত একে অপরের সাথে। একদিন ইংলিশ ম্যাডাম আমাকে পিছন থেকে উঠিয়ে এনে সামনের বেঞ্চে বসালেন। সেই থেকে আর পিছনে বসে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়নি।
আমার জন্য সেটাই আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। কারণ, আসমাও যে সামনের সারিতেই ডান পাশে বসত! আর আমরা ছেলেরা বসতাম বাম পাশে। এক পলকে বিভোর হয়ে দেখতাম তাকে। খুব ভালো লাগত মেয়েটাকে। মনটা আর আমার মধ্যে রইল না। সারাক্ষণ শুধু তাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকত আমার মানস। কল্পনার তুলিতে হৃদয়ের ক্যানভাসে কত ছবি যে এঁকেছি, তার হিসাব আমারও জানা নেই।
আমাদের বন্ধুত্ব গভীর ছিল। আমার পছন্দের ব্যাপারটি বন্ধুদের মাঝে চাউর হওয়াতে আসমা একটু অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিল। বন্ধুত্বপূর্ণ যে সম্পর্কটি তার সাথে ছিল, সেটাও ধীরে ধীরে ম্লান হতে লাগল। কিন্তু, আমি তো রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছি তার প্রেমে! সে যতই জানুক বা বুঝতে পারুক যে আমি তাকে ভালোবাসি, সেটা আমার পক্ষ থেকে তাকে না জানালে পুরো বিষয়টিই অর্থহীন থেকে যায়।
অতএব, সিদ্ধান্ত নিলাম তাকে আনুষ্ঠানিকভাবেই জানাতে হবে। প্রস্তাব দিতে হবে তাকে। আমাদের এক সহপাঠীকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠালাম, যে কিনা আমাদের দুজনেরই খুব ঘনিষ্ঠ। আসমা সেদিন খুব চাতুরতার আশ্রয় নিয়েছিল। সে তখন প্রস্তাব উত্থাপনকারীকে বলেছিল, সে নাকি আমাকে শুধুই বন্ধুর চোখে দেখে। আর তাছাড়া এখন শুধুই পড়াশোনা নিয়ে ভাবার সময়। যদিও সে নিশ্চিত করেছিল যে, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বন্ধুত্বের জায়গাটা নষ্ট হবে না।
কিন্তু, তাই কি হয়!? অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই দূরত্ব বাড়তে লাগল আমাদের। কলেজের সবাই জেনে গিয়েছিল ব্যাপারটা। আসমা বলেছিল: “এখন আমরা দুজনেই মন দিয়ে পড়াশোনা করি। ওসব বিষয় নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আর আমি যা কিছু করব, আমার পরিবারের সায় বা মত নিয়েই করব।”
এভাবেই চলতে চলতেই আমরা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করলাম। উত্তীর্ণ হলাম দুজনেই। কাকতালীয়ভাবে দুজনেই ভর্তি হয়েছিলাম যশোর এম. এম. কলেজে। কিন্তু, এম. এম. কলেজে গিয়ে তার সখ্যতা আর আগের মতো রইল না। যদিও, তখনও আমি আমার মানসপটের ক্যানভাসে দিবানিশি এঁকে চলেছি তার ছবি।
সংসারের অসচ্ছলতার কারণে আমি রণে ভঙ্গ দিলাম, অর্থাৎ পড়াশোনাটা ঠিক চালিয়ে যেতে পারলাম না। আবার আলহেরা কলেজে এসে ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি হলাম। আসমা অনার্স আর মাস্টার্স শেষ করল। এরই মাঝে আসমা তারই এক সহপাঠীকে মন দিয়ে ফেলল। সম্পর্কটা বিয়ে পর্যন্ত গড়াল। আমি সেটা জানতে পেরেছি পরে।
একদিন এ. ডি. ডি. বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধি হয়ে একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণে গিয়েছিলাম। সেখানে আসমা দায়িত্ব পেয়েছিল প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে। অনেক দিন পর তাকে দেখে খুব পুলকিত হয়েছিলাম। নির্বাচনের ফাঁকেই কিছুটা সময় তার সাথে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। কথোপকথনের এক পর্যায়ে আমি তাকে আহ্বান জানালাম একসাথে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য। পাশেই আমার বোনের বাসা ছিল। কথা ছিল আমরা দুজনেই আমার বোনের বাসা থেকে খেয়ে আসব।
কিন্তু, হঠাৎ ওর স্বামীর ফোন। সে এসে আসমার খাবার দিয়ে গেল আর বলে গেল বিকেলে এসে তাকে নিয়ে যাবে। আসমা ও আমি আর একসাথে লাঞ্চ করা হল না। বিকালে আর একসাথে ফেরা হলো না। ও ওর মতো, আর আমি আমার মতো বেরিয়ে গেলাম ওখান থেকে। শেষ বিদায়ের পূর্বে ও আমাকে শুভাশিস জানিয়েছিল কি না, তা ঠিক মনে নেই। তারপর আর অনেক দিন তার সাথে দেখা হয়নি আমার।
অবশ্য, অতঃপর একদিন ঝুমঝুমপুর বটতলায় আবার চিরচেনা সেই মুখ দর্শনের সুযোগ হয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। সেদিনও তার স্বামী মশাই এসে তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর অনেক সময় গড়িয়েছে কালের চাকার আবর্তে। কিন্তু, সেই আসমার একটা টেকসই স্থান ঠিকই রয়ে গেছে আমার হৃদয়ের গহীনে।
অপ্রাপ্তির এত দুঃখের মাঝেও সে যে এখনও আমার অন্তরাত্মার সবটুকু জুড়ে আছে, সেটাও তো বোধকরি ভালোবাসা। তার অপূর্ণতায় আজ পরিপূর্ণ আমি। তাকে ভেবেই যে কেটে যায় আমার বেলা! একেই বোধকরি বলে ভালোবাসা।